Home » Blog » মতামত » সামাজিক অবক্ষয় থেকে উত্তরণ কোন পথে

সামাজিক অবক্ষয় থেকে উত্তরণ কোন পথে


আমি জীবনে প্রথম মিছিলে যাই ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। গ্রামে একটি থানা হেডকোয়ার্টারে স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। স্কুলে গিয়ে দেখলাম ছাত্ররা মাঠের পাশে একটি জামগাছ তলায় সমবেত হয়েছে এবং বলছে—আজ স্ট্রাইক, আমরা ক্লাস করব না। স্ট্রাইক কী, আমি জানতাম না। নবম-দশম শ্রেণির ছাত্ররা জানাল, ঢাকায় নুরুল আমিনের পুলিশ ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের ওপর গুলি চালায় এবং তাতে কয়েকজন ছাত্র নিহত হয়। নুরুল আমিন তখন মুখ্যমন্ত্রী। ছাত্ররা বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানাচ্ছিল। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে জীবনে প্রথম স্লোগানে শরিক হলাম : ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই—নুরুল আমিনের কল্লা চাই। মুসলিম লীগ মুসলিম লীগ—ধ্বংস হোক ধ্বংস হোক। পাকিস্তান পাকিস্তান—জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।’ ১৯০৫ সালে সূচিত বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় যে গণজাগরণ দেখা দিয়েছিল, তা ব্রিটিশ শাসন অতিক্রম করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সরকারবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনবোধ যুক্ত হয়ে গেল সেই গণজাগরণের উত্তাপের মধ্যে। রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) কাল থেকে চলে আসছিল বৌদ্ধিক জাগরণ বা রেনেসাঁস, যার ধারা ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে বহমান ছিল। গণজাগরণও ১৯৭০-এর দশক পর্যন্তই বহমান ছিল। ১৯৮০-র দশক থেকে সরকার উত্খাতের ও ক্ষমতা দখলের যেসব আন্দোলন চলে আসছে, সেগুলোতে গণজাগরণের উত্তাপ নেই। গণজাগরণে সদর্থক মহান লক্ষ্য থাকে, জনগণের মধ্যে মহৎ মানবিক গুণাবলির সক্রিয়তা থাকে, মহান নেতৃত্ব থাকে। যে ঘটনাকে ‘নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান’ বলা হয়, যে আয়োজনকে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ বলা হয়, সেগুলোতে কি গণজাগরণ ছিল?

১৯৮০-র দশকে সুধীসমাজ সংগঠনের (Civil Society Organizations) বিকাশ ও তৎপরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটে গেছে। ক্রমে depoliticization বা নিঃরাজনীতিকরণ ঘটে গেছে। রাজনীতি এখন ক্ষমতা ও অর্থবিত্ত অর্জনের লড়াই, গণতন্ত্র এখন নির্বাচনতন্ত্র। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানেও কৃতকার্য হচ্ছে না।

আমাদের রাজনীতির একটি বৈশিষ্ট্য এই যে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় সব সময় এই রাজনীতিতে সরকার উত্খাতের ও নেতিবাচক (negative) দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য দেখা গেছে। এর মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা গেছে ১৯৫৪ সালে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা আন্দোলনে এবং ১৯৬৬ সাল থেকে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছয় দফা আন্দোলনে। একুশ দফা আন্দোলন ও ছয় দফা আন্দোলনে সদর্থক লক্ষ্য ছিল। যা হোক, রাজনীতির প্রকৃতি ইতিহাসের ধারা ধরে তথ্যনিষ্ঠা ও সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে বিচার করে দেখতে হবে। বাংলাদেশে ইতিহাস-বিকৃতি একটি মৌলিক সমস্যা। কোনো জাতির ইতিহাসকে বিকৃত করা হলে সেই জাতির আত্মাই বিকৃত হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতি সুস্থ ও স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশকে উঠতে হলে ইতিহাস-বিকৃতির গ্রাস থেকে মুক্ত হতে হবে এবং ইতিহাসের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে।

রাজনৈতিক দলে গুরুত্ব না দিয়ে নাগরিক কমিটি, নাগরিক ঐক্য, নাগরিক আন্দোলন, নাগরিক উদ্যোগ ইত্যাদির মাধ্যমে জনজীবনের সমস্যাবলি এবং জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের বিবেচনা বাদ দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র (আসলে ধনিক-বণিক-সাম্রাজ্যবাদীদের নির্বাচনতন্ত্র) প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর পরিণতি অবশ্যই ভালো হবে না। ১৯৮০-র দশক থেকেই বাংলাদেশের জনগণ জাগ্রত অবস্থা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় নিপতিত হয়ে চলছে। নিজেদের কোনো গুরুতর বিষয়ের প্রতিই তাদের বিশেষ মনোযোগ ঘটে না। এর পরিণতি ভালো হবে কিভাবে?

২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের সচেতন প্রচেষ্টার মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় দেশে সদর্থক (Positive) দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার প্রচারকার্য। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরাও এই প্রচারকার্যে তৎপর। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সফল। নেতিবাচক (Negative) অস্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যেসব দল সরকারবিরোধী আন্দোলন করছে, তারা একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। বাস্তবে এর অর্থই দাঁড়ায়—আওয়ামী লীগ প্রবল হয়েছে এবং প্রবল হচ্ছে। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জাতি গঠনের এবং জাতির মনকে জাতীয় হীনতাবোধ (National inferiority complex) থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে না। আর দলটির নেতাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাব না থাকার ফলে কর্তৃত্ববাদী একনায়কতন্ত্র প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। এর মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে চলছে। ইতিহাস বিকৃতির সমস্যা বাড়ছে। জনসাধারণ ঘুমন্ত থাকার ফলে আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ব্যাঘাত ঘটছে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কর্তৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে। ক্ষমতা-অভিলাষী দলগুলোর দুই কূল রক্ষা করে চলা সহজ ব্যাপার নয়।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে যে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি দেশে গড়ে তুলেছে, তা কিন্তু সমাজের উচ্চস্তর অতিক্রম করে বৃহত্তর জনসাধারণ পর্যন্ত প্রসারিত নয়। প্রকৃতপক্ষে বৃহত্তর জনসাধারণের ন্যায়স্বার্থ দেখার মতো কোনো রাজনৈতিক দল দেশে নেই। মার্ক্সবাদী দল যেগুলো সামনে আছে তারা এনজিও ও সিএসওদের সঙ্গে মিলে সাম্রাজ্যবাদী কর্মনীতির অনুসারী হয়ে কাজ করছে। জনসাধারণের মধ্যে জাতীয় হীনতাবোধ আছে। আর জনসাধারণ ঘুমন্ত। জনগণ বুঝতে পারছে না এবং বুঝতে চাইছে না বটে, তবে জনজীবনে সমস্যার অন্ত নেই। জনগণ পদে পদে হয়রানির, বঞ্চনার, জুলুম-জবরদস্তির, লুটপাটের ও ধর্ষণের শিকার। সমাজ ভেতর থেকে ক্ষয় পেয়ে যাচ্ছে। সরকারি দলের কিংবা অন্য কোনো দলের এসবের দিকে দৃষ্টি অল্পই আছে। বুদ্ধিজীবীরা দলীয় অবস্থান নিয়ে থাকার কারণে এবং এনজিও-সিএসওতে যুক্ত থাকার কারণে রাষ্ট্র, জাতি ও জনজীবনের প্রতি মনোযোগী নন। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, বিচারক ও আইনজীবীরা, শিক্ষকরা বিশ্বব্যাংকের কর্মনীতি অনুসরণ করে চলছেন। ফলে জনজীবন, জাতি ও রাষ্ট্র কোনোক্রমেই প্রগতির ধারায় নেই। সদর্থক আদর্শ ও কর্মনীতি ছাড়া শুধু ধর্মনিরপেক্ষতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে কি প্রগতি হয়? প্রগতি মানে কী?

জাতীয় জীবনে অবক্ষয়ের স্রোত প্রবলভাবে বইছে। মূল্যবোধ, নৈতিক চেতনা পাত্তা পাচ্ছে না। জনগণও জুলুম-জবরদস্তি, দুর্নীতি ও অনাচারকে মেনে নিয়েই চলছে। জবরদখল, হত্যা-আত্মহত্যা চলছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার ক্ষয় পেয়ে গেছে, ড্রাগের প্রচলন বেড়ে চলছে। পত্রপত্রিকায়, টেলিভিশন চ্যানেলে সমাজের ভেতরকার চিত্র অল্প প্রকাশিত হচ্ছে। প্রচারমাধ্যম কাজ করছে Status quo রক্ষা করে—কায়েমি স্বার্থবাদের পক্ষাবলম্বন করে। সরকার সরকারি স্বার্থে, সরকারি দল সরকারি দলের স্বার্থে যে যে সদর্থক (Positive) দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে, তা অবলম্বন করে প্রচারমাধ্যম কাজ করছে। টক শো, পোস্ট-এডিটরিয়ালও কাজ করছে Status quo-র বিশ্বস্ত অনুসারী হয়ে। এ অবস্থায় সাংবিধানিক উপায়ে প্রগতি সম্ভব নয়। অসাংবিধানিক উপায়ে কি প্রগতি সম্ভব হয়? ১৯৭৫ সালে, ১৯৮১ সালে, ১৯৯০ সালে, ২০০৭ সালে অসাংবিধানিক উপায়ে যেসব রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে সেগুলো দ্বারা বাংলাদেশ কি প্রগতির পথ পেয়েছে? দোষ শুধু কি অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদেরই? বৈধ সরকারগুলোর আত্মসমালোচনার ও আত্মোৎকর্ষের কোনো বিকল্প কি আছে? সুস্থতার দিকে এগোতে হলে বৈধ সরকারগুলোও কতটা বৈধ ও স্বাভাবিক, তাও বিচার্য।

খবরে প্রকাশ, ‘ঢাকাসহ সারা দেশে সম্প্রতি ঘটা হত্যাকাণ্ড নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পুলিশ। কী কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তা বের করতে পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা মাঠে নেমেছে। সাম্প্রতিক আলোচিত সব হত্যাকাণ্ডের কারণ দ্রুত উদ্ঘাটন ও খুনিচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। দেশের সব কটি রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের কাছে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা পৌঁছেছে। নির্দেশনা পেয়ে ইতিমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাঙামাটির ঘটনা নিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিজেদের মধ্যে দলাদলির কারণে খুনখারাবি লেগেই আছে। এর মধ্যে ছয়জনের নিহত হওয়ার ঘটনা সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সমস্যা রাজনৈতিক, সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হতে পারে। পুলিশ রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। শুধু পার্বত্য জেলাগুলোতেই নয়, সারা দেশে অনেক হত্যাকাণ্ড চলছে। সেগুলোর কোনো কোনোটি রাজনৈতিক, কোনো কোনোটি অন্য নানা কারণে ঘটছে। যখন রাজনৈতিক অবস্থা অস্বাভাবিক থাকে তখন সব ধরনের অপরাধ ও খুনাখুনিই বেড়ে যায়। বাংলাদেশে এখন সেই অবস্থাই চলছে।

সরকার এটা স্বীকার করে না। সরকারের বিবেচনায় রাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক আছে। যা কিছু অপরাধমূলক কাজ হচ্ছে, সব স্তরের প্রচার অনুযায়ী সেগুলো বিএনপি ও জামায়াত করছে। বিএনপি-জামায়াত কঠোর পুলিশি নিয়ন্ত্রণে ও মামলার মধ্যে পড়ছে। হত্যা, গুম ইত্যাদিও কম নয়।

সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দলীয় লোকেরা বলে থাকেন, হত্যা-আত্মহত্যা এসব সব সময়ই ছিল, আছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এসব মোটেই বড় ব্যাপার নয়—সব কিছু স্বাভাবিকের সীমার মধ্যে আছে। সরকারি দলের ও সরকারের কথার প্রতিধ্বনি করে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরাও সময়ে সময়ে একই কথা বলে থাকেন। কখনো কখনো পুলিশের কর্তারা সরকারকে খুশি করার জন্য সরকারি লাইনে অনেক কথা বাড়িয়েও বলে থাকেন।

আমার যোগাযোগ খুব সামান্য, নড়াচড়াও খুব কম। এ ক্ষেত্রে মূলত প্রচারমাধ্যম আমার অবলম্বন। আমার ধারণা—অপরাধ, অসামাজিক কার্যকলাপ, জুলুম, জবরদস্তি, দুর্নীতি, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, ঋণখেলাপি, দুর্নীতি ইত্যাদি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এমন একটা ঐতিহাসিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যাকে বলা যায় অবক্ষয়ের কাল। এই সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য শুধু পুলিশ আর আইন-আদালতের ওপর নির্ভর করে সুফল খুব অল্প ও সাময়িক হবে। দীর্ঘস্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে পারে। প্রচলিত রাজনীতি দিয়ে তা হতে পারে না। উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল ও জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার লাগবে। এর পূর্বসূত্র হিসেবে দরকার সমাজতাত্ত্বিক, রাষ্ট্রতাত্ত্বিক, মমস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক অধ্যায়-অনুস্বাক্ষর। বাংলাদেশের বাঙালি জাতির মধ্যে আজ সে বিষয়ে চিন্তা-চেতনার জাগরণ ও নতুন কর্মধারা কাম্য।

লেখক : রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তক

প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়