Home » Blog » বাংলাদেশ » জাতীয় » খুলনার মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক

খুলনার মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক


খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র পদটি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে দখলে ছিল বিএনপির। ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে পর পর দুটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শেখ তৈয়েবুর রহমানের নিকট আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের ধাক্কায় শেখ তৈয়েবুর রহমান মেয়র পদ থেকে ছিটকে পড়েন। তার জায়গায় দায়িত্ব দেয়া হয় তখনকার মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিকে। ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসাবে তিনি প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের ৪ আগস্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক প্রায় ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে মনিরুজ্জামান মনিকে পরাজিত করে ‘মেয়র ’পদটি দখল করেন। তবে ওই নির্বাচনে মনি স্থানীয় বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীকে পাশে পাননি। ঠিক তেমনি ভাবে খুলনা নগরের ব্যাপক উন্নয়ন করেও ২০১৩ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে প্রায় ৬১ হাজার ভোটের ব্যবধানে মনিরুজ্জামান মনির নিকট পরাজিত হন এই হেভিওয়েট প্্রার্থী। তখন তিনিও আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীকে পাশে পাননি। এ কারণে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কাজ করছে। ফলে আগামী নির্বাচনে তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হতে চাইছেন না। যদিওবা দল মনোনয়ন দিতে পুরোপুরি সমর্থন তাকেই দিয়েছেন। মুসলিম লীগ অধ্যাষুত কেসিসির মেয়র পদে ডাক সাইডের কোন নেতা প্রার্থী হতে চাইছেন না। খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র ও খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি কাজি আমিনুল হককে বুধবার ঢাকায় ডেকে মেয়র পদে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু হাইকমান্ডের সে প্রস্তাব তিনিও ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে দলীয় নির্ভরযোগ্য একটি সুত্র জানায়। এক্ষেত্রে বিএনপির প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্দিতা গড়তে পারেন একমাত্র তালুকদার আব্দুল খালেকই। শেষ পর্যন্ত তিনিই প্রার্থী হতে পারেন বলে জানাগেছে।

এদিকে ২০১৩ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে তালুকদার খালেকের পরাজয়ে পেছনে ২৪ টি কারণ পরিলক্ষিত হয়েছে। যদিওবা নির্বাচনের পরের দিন সম্মিলিত নাগরিক কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী তিন কারণে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের পরাজয় হয়েছে বলে মত বিনিময় সভায় উল্লেখ করেছিলেন।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক সাড়ে ৪ বছর নগর পিতা হিসেবে সেবা করেছেন। বাগেরহাটের সংসদ সদস্য হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন। সরকারের ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এত বড় প্রতিবন্ধকতা আর কখনও আসেনি। মেয়র দায়িত্ব পালন কালে তিনি এ যাবতকালের সর্বাধিক ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ আনতে পেরেছিলেন। বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে প্রায় ২৭৫ কোটির প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এ সময়ের মধ্যে ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। করপোরেশন ছেড়ে আসা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭শ’ কোটি টাকার নানা প্রকল্প পাইপ লাইনে রেখে এসেছিলেন। দায়িত্বকালে নেয়া প্রকল্পগুলো মধ্যে স্বল্পমেয়াদী প্রকল্পের কাজগুলো শেষ হয়েছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের কাজও বাস্তবায়ন হয়েছে।
তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে আমি খুলনা মহানগরীকে পরিকল্পিত ও উন্নত নগর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। খুলনা সিটি করপোরেশনের সামগ্রিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে সামর্থ হয়েছি। এছাড়া অনিয়ম ও দুর্নীতি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে কেসিসি ছিল একটি দেনাগ্রস্থ প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব আয়ের তেমন কোন উৎস্য ছিল না। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন উন্নয়ন খাত ও আয়ের উৎস সৃষ্টি করে কেসিসিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সবরকম চেষ্টা করেছি। তার ফলও পাওয়া গেছে। কেসিসি’র রাজস্ব আদায় ও আয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। খুলনা মহানগরসহ করপোরেশনের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে। ব্যাংকের মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য খাতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ায় নগরবাসী ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে। ৫ বছরে আমার দেয়া অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রæতির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে খুলনা মহানগরীর রাস্ত-ঘাটের উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে বেশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শহীদ হাদিস পার্ক আধুনিকায়ন হয়েছে। তিনি আরো বলেন, কাজ করতে গিয়ে অনেক ভুলভ্রান্তি হয়, আমরও হয়েছে। তারপরেও সততা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি।

মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের পরাজয়ের পেছনে ২৪ টি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে- ২০১৩ সালের ৫মে’র রাতে রাজধানীর শাপলা চত্বরে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রোপটে হেফাজতে ইসলামের অনুসারীদের বিরোধিতা, তার সাড়ে ৪ বছরের শাসনামলে গণমাধ্যমে ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরা, বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে গালিগালাজ করা, কর্মচারি ও ুদে ব্যবসায়ী এবং পুলিশকে চড়থাপ্পর মারা, কেসিসির সিংহভাগ কর্মচারী অসন্তুষ্ট, শাসকদলের মধ্যে প্রতিহিংসা, মেয়রের দায়িত্বকালীন সময়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া, ঠিকাদারদের অসন্তুষ্টি, সুবিধাবঞ্চিত যুবলীগ ুব্ধ হওয়া, গেল বারের দেওয়া প্রতিশ্রæতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া, ২০০৮ সালে নির্বাচিত কাউন্সিলররা সুবিধা না পাওয়ায় তাদের বেশিরভাগের বিরোধিতা, ২০১৩ সালের নির্বাচনে দলের কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সমর্থন না পাওয়া, ভারতে বসে দলের শীর্ষ তিন সংগঠকের খালেক বিরোধী বৈঠক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থন না পাওয়া, সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীকে সম্মিলিত নাগরিক কমিটিতে প্রধান করা, ফেসবুকে দোকানদারকে চড় মারার দৃশ্য, দুই মাছ কোম্পানীর মালিকের বিরোধিতা, ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তাদের নির্বাচনী তৎপরতায় অংশ না নেয়া, শেখ রাজ্জাক আলীকে খুলনা-২ আসনে দলের মনোনয়ন দেয়ার আশ্বাসের প্রেেিত মিজানুর রহমান মিজানের অনুসারী-গোপালগঞ্জ অধিবাসীদের ুব্দ হওয়া, ওয়াসার জমি অধিগ্রহণের সময় দৌলতপুরের দেয়ানায় জনগণের নাখোশ হওয়া, কাউন্সিলর শহীদ ইকবাল বিথার হত্যা মামলায় আসামীদের ১৬১ ধারা জবানবন্দী অনুযায়ী দলের সমর্থকদের ফাঁসানোর চেষ্টা করা, রূপসা পাইকারী কাঁচাবাজার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া এবং রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে কৃষি জমি রা কমিটির বিপে অবস্থান নেয়া।

তবে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী (প্রয়াত) ২০১৩ সালের ১৬ জুন সাংবাদিকদের সাথে এক মত বিনিময়ে তিন কারণে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের পরাজয় হয়েছে। এই কারণগুলো হচ্ছে দেশের সার্বিক রাজনীতি, দলের সহযোগিতা না পাওয়া এবং ত্রে বিশেষে তালুকদার আব্দুল খালেকের আচার-ব্যবহারে মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া।

তিনি বলেন, প্রথমত দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মানুষের মনে যে তের সৃষ্টি হয়েছে, তার বহি:প্রকাশ ঘটেছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এছাড়া দলের প থেকেও তিনি পুরোপুরি সহযোগিতা পাননি। তাছাড়া খালেকের ব্যক্তিগত কিছু আচার-আচরণের কারণে মানুষ কষ্ট পেয়েছে, এই নির্বাচনে তারও প্রভাব পড়েছে। কাজ করতে গেলে কখনো কখনো কারো সাথে রূঢ় আচরণ করতে হয়। খালেকও তাই করেছেন, সেটি দোষের কিছু নয়। তিনি মেয়র থাকাকালে খুলনার উন্নয়নে বেশ কাজ করেছেন। কিন্তু নির্বাচনে এই কাজের কোন প্রভাব পড়েনি। মানুষ সরকারের কর্মকন্ডে ুব্ধ হয়েই সরকারের বিরুদ্ধে এই রায় দিয়েছে।

এদিকে গত ২ এপ্রিল রাতে খুলনা মহানগর বিএনপির জরুরী বর্ধিত সভায় সর্বসম্মতিভাবে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামীলীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক এমপিকে মনোয়ন দেওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মতি ভাবে গৃহীত হয়েছে। ওই সভায় প্রস্তাবটি দেন মহানগর সভাপতি ও খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান। এসময়ে তিনি বলেন, সকল ভেদাভেদ ভুলে তালুকদার আব্দুল খালেককে বিজয়ী করতে সকল নেতা-কর্মী আন্তরিকভাবে কাজ করবে। অথচ একজন সংসদ সদস্য ও তার অনুসারীরা ২০১৩ সালের নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেকের বিরোধিতা করেছিলেন বলে দলের সিনিয়র নেতারা অভিযোগ করে থাকেন।

মন্তব্য করুন

এখানে মন্তব্য করুন